খাবারের নামে ‘বিষ’ খাচ্ছে শিশুরা, সপ্তাহে লুট ১৭ কোটি টাকা!
স্কুল ফিডিং কার্যক্রমে পচা ডিম, দুর্গন্ধযুক্ত রুটি ও কাঁচা কলা; ক্ষুব্ধ অভিভাবক ও সচেতন মহল
বিশেষ প্রতিবেদক।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিশুদের পুষ্টির ঘাটতি পূরণে নেওয়া ‘স্কুল ফিডিং’ কর্মসূচি এখন একশ্রেণির অসাধু সিন্ডিকেটের অবাধ লুটপাটের চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। পুষ্টিকর খাবারের নামে শিশুদের মুখে তুলে দেওয়া হচ্ছে পচা ডিম, বাসি-দুর্গন্ধযুক্ত রুটি এবং খাওয়ার অনুপযোগী কাঁচা বা কালো দাগযুক্ত নিম্নমানের কলা। মাঠপর্যায়ের এই চরম অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে অনেক অঞ্চলেই শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। অভিভাবকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন— “সরকার শিশুদের পুষ্টির জন্য টাকা দিচ্ছে, কিন্তু কিছু অসাধু সিন্ডিকেট খাবারের নামে বিষ খাওয়াচ্ছে।”
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রায় ৫,০০০ কোটি টাকার এই বৃহৎ প্রকল্পে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর চুক্তির শর্ত ভঙ্গের কারণে প্রতি সপ্তাহে সরকারের প্রায় ১৭ কোটি টাকা অপচয় বা লুটপাট হচ্ছে।
দেশজুড়ে ভয়াবহ চিত্র: দুর্গন্ধযুক্ত রুটি ও পচা ডিমের সয়লাব
অনুসন্ধানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের স্কুলগুলোতে খাবার সরবরাহের নামে চরম জালিয়াতির চিত্র উঠে এসেছে। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের একাধিক বিদ্যালয়ের অভিভাবক ও শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন, শিশুদের দেওয়া খাবারে পচন ও দুর্গন্ধ থাকা এখন নিত্যদিনের ঘটনা।
চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা: এই দুই অঞ্চলের বেশ কিছু স্কুলে সরবরাহকৃত বনরুটি এতটাই শক্ত যে তা শিশুদের পক্ষে চিবিয়ে খাওয়া অসম্ভব। অনেক প্যাকেটে রুটিতে ছত্রাক ও দুর্গন্ধ পাওয়ার অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরাই।
বরিশাল ও রংপুর: বরিশাল অঞ্চলের বাকেরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় দুপুরের পর খাবার পৌঁছানোর কারণে সকালের শিফটের খুদে শিক্ষার্থীরা খাবার ছাড়াই বাড়ি ফিরছে। ডিমের আকৃতি চুক্তির চেয়ে অনেক ছোট এবং অধিকাংশ সময়ই তা ভেতর থেকে পচা ও কালো থাকে।
ময়মনসিংহ: এই অঞ্চলে কলার মান সবচেয়ে শোচনীয়। পুষ্টিকর ও পাকা কলার পরিবর্তে সরবরাহ করা হচ্ছে কালো দাগযুক্ত, অতি ক্ষুদ্র বা পুরোপুরি কাঁচা কলা, যা শিশুদের বদহজমের কারণ হচ্ছে।
খাবারে বিষক্রিয়া: হাসপাতালে শিক্ষার্থীরা
নিম্নমানের এই খাবার শুধু পুষ্টিহীনতাই ছড়াচ্ছে না, বরং শিশুদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করেছে। সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায় স্কুল ফিডিংয়ের সরবরাহকৃত বাসি পাউরুটি খেয়ে অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী তীব্র পেটব্যথা ও বমি নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। এছাড়া মাদারীপুর ও দেশের অন্যান্য জেলাতেও একই ধরনের বাসি খাবার খেয়ে স্থানীয়ভাবে শিক্ষার্থীদের অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর পাওয়া গেছে, যা জনমনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
সপ্তাহে ১৭ কোটি টাকা লুটের নেপথ্যে ‘সিন্ডিকেট’
সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সুপরিকল্পিত দুর্নীতি। নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি শিশুর জন্য নির্ধারিত বাজেটে মানসম্মত ডিম, কলা ও বিস্কুট দেওয়ার কথা। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগী ও এজেন্টদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বাজার থেকে সবচেয়ে সস্তা, নিম্নমানের ও প্রায় বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া খাবার নামমাত্র মূল্যে কিনে সরবরাহ করছে। এর মাধ্যমে প্রকল্পের মোট বাজেটের একটি বিশাল অংশ সরাসরি সিন্ডিকেটের পকেটে যাচ্ছে, যার পরিমাণ সপ্তাহে প্রায় ১৭ কোটি টাকা বলে অনুমিত হচ্ছে।
দায় এড়ানোর চেষ্টা, তবে বাড়ছে কড়াকড়ি
বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমের কঠোর অনুসন্ধানের পর নড়েচড়ে বসেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। মন্ত্রণালয় থেকে ইতিমধ্যে একটি জরুরি পরিপত্র জারি করে মাঠপর্যায়ে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে:
খাবার গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা: প্রধান শিক্ষকদের স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, খাবার বুঝে নেওয়ার আগে মান যাচাই করতে হবে। সামান্যতম ত্রুটি বা দুর্গন্ধ থাকলে তা সরাসরি ফেরত পাঠাতে হবে।
কঠোর আইনি পদক্ষেপ: চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঘটনার পর ভ্রাম্যমাণ আদালত সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারীকে জরিমানা করেছে। ফরিদপুরে অনোপযোগী কাঁচা কলা বিতরণের দায়ে একজন সহকারী শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
লাইসেন্স বাতিল ও মামলা: দুর্নীতিগ্রস্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ও ব্ল্যাকলিস্ট (কালো তালিকাভুক্ত) করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
জনআকাঙ্ক্ষা ও আগামী দিনের প্রত্যাশা
জাতীয় এই কর্মসূচির এমন করুণ দশা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সচেতন মহল মনে করেন, কেবল পরিপত্র জারি বা সাময়িক বরখাস্তই যথেষ্ট নয়। শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে যারা এই ‘বিষের খেলা’ খেলছে, সেই মূল সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে, পুষ্টির এই মহৎ প্রকল্প ভেস্তে যাবে এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ কেবলই অসাধুদের পকেটে জমা হবে।