চট্টগ্রামের অস্তিত্ব ও অধিকার রক্ষার লড়াই! বিপিসির প্রধান কার্যলয় ঢাকায় হস্তান্তরের প্রতিবাদে ৭জুন রাজপথে নামছে ‘সচেতন চট্টলাবাসী’,প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি.
নিজস্ব প্রতিবেদক:
চট্টগ্রাম নগরের অভিজাত সার্সন রোডের জয়পাহাড় এলাকায় চোখ ধাঁধানো পাঁচতলা নতুন ভবন। সরকারের প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই নান্দনিক ভবনটি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) স্থায়ী প্রধান কার্যালয়। আগামী ঈদুল আজহার পরপরই জমকালো আয়োজনে ভবনটি উদ্বোধনের সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত। কিন্তু চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এই নতুন ও স্থায়ী কার্যালয়ে পা রাখার আগেই তল্পিতল্পা গুটিয়ে পুরো প্রধান কার্যালয়টিই স্থায়ীভাবে ঢাকায় সরিয়ে নেওয়ার জোরালো তৎপরতা শুরু হয়েছে। শীর্ষ কর্মকর্তাদের ‘ঢাকা-প্রীতি’ এবং চট্টগ্রাম বিমুখতার কারণেই সরকারের এই বিশাল অঙ্কের অবকাঠামোটি উদ্বোধনের আগেই পরিত্যক্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
কোটি টাকার ভবন ফেলে ঢাকা যাওয়ার নেপথ্যে
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১২ মে ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৭১ বিধি অনুসারে একটি নোটিশের পর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এই স্থানান্তরের যৌক্তিকতা এবং আইনগত বিষয়ে বিপিসি চেয়ারম্যানের মতামত চেয়ে চিঠি পাঠায়।
মন্ত্রণালয়ের এই চিঠির পর বিপিসির অভ্যন্তরে দফায় দফায় ফাইল চালাচালি ও গোপন বৈঠক চলছে। নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে, বিপিসির চেয়ারম্যানসহ শীর্ষ পরিচালকদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরেই চট্টগ্রাম থাকতে অনীহা প্রকাশ করে আসছিলেন। তারা মাসের বেশির ভাগ সময় ঢাকার কারওয়ান বাজারে অবস্থিত বিপিসির লিয়াজোঁ (যোগাযোগ) অফিসে কাটান। চট্টগ্রামে নিজস্ব স্থায়ী ভবন প্রস্তুত হওয়ার পর সেখানে নিয়মিত অফিস করার বাধ্যবাধকতা এড়াতেই এখন পুরো কার্যালয় ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার এই চতুর প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সরকারের বিকেন্দ্রীকরণ নীতি ও চরম বৈপরীত্য
বিপিসির এই ঢাকা-মুখী সিদ্ধান্ত সরকারের ঘোষিত প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। দেশের জ্বালানি খাতের হৃদপিণ্ড বলা হয় চট্টগ্রামকে। অথচ মাঠপর্যায়ের বাস্তব কর্মযজ্ঞ থেকে শত মাইল দূরে বসে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে নীতি নির্ধারণের এই চেষ্টা আমলাতান্ত্রিক খামখেয়ালিপনার এক চরম দৃষ্টান্ত।
১. পুরো অপারেশন চট্টগ্রামে: দেশের একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগার ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি’ চট্টগ্রামে অবস্থিত। বিদেশ থেকে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল খালাস, সংরক্ষণ এবং বিতরণের মূল নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর ও পতেঙ্গা।
২. বিপণন জায়ান্টদের অবস্থান: বিপিসির অধীনস্থ তিন প্রধান তেল বিপণন কোম্পানি—পদ্মা অয়েল, মেঘনা অয়েল এবং যমুনা অয়েলের প্রধান স্থাপনা ও সদর দপ্তর চট্টগ্রামের পতেঙ্গায়।
৩. মেগা প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ: ৮ হাজার ২৯৮ কোটি টাকার এসপিএম (সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং) প্রকল্প এবং ৩ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকার চট্টগ্রাম-ঢাকা জ্বালানি পাইপলাইন প্রকল্পের মূল অপারেশনাল হাব চট্টগ্রাম।
ক্ষুব্ধ অংশীজন ও বিশেষজ্ঞরা
চট্টগ্রামকে দেশের ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ ঘোষণার যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি রয়েছে, বিপিসির এই সিদ্ধান্ত তার মুখে বড় চপেটাঘাত বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদরা।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) একজন জ্যেষ্ট কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "জনগণের ৫০ কোটি টাকা করের টাকায় চট্টগ্রামে ভবন বানিয়ে এখন কর্মকর্তারা ঢাকায় বিলাসী জীবন যাপনের জন্য অফিস সরাতে চাইছেন। এটা রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় এবং এক ধরনের দুর্নীতি।"
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, জ্বালানি খাতের সব অংশীজন চট্টগ্রামে অবস্থিত। প্রধান কার্যালয় ঢাকায় চলে গেলে সাধারণ ব্যবসায়ী, ঠিকাদার এবং সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের ফাইল সই করাতে প্রতিনিয়ত ঢাকা-চট্টগ্রাম দৌড়াতে হবে। এতে ব্যবসার খরচ (Ease of Doing Business) আরও বাড়বে।
৭ই জুন রাজপথে নামছে ‘সচেতন চট্টলাবাসী’
বিপিসির প্রধান কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তরের এই প্রশাসনিক ষড়যন্ত্র ও বৈষম্যের পাঁয়তারার প্রতিবাদে এবার চূড়ান্ত আন্দোলনের ডাক দিয়েছে চট্টগ্রামের সর্বস্তরের নাগরিক সমাজ। ‘সচেতন চট্টলাবাসী ও চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী-সুশীল সমাজ’-এর যৌথ উদ্যোগে আগামী ৭জুন ২০২৬, রবিবার বিকাল ৩টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে এক বিশাল বিক্ষোভ মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচির ঘোষণা করা হয়েছে।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে
জানান মানববন্ধন শেষে একটি প্রতিনিধি দল চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের (ডিসি) মাধ্যমে সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করবেন। স্মারকলিপিতে চট্টগ্রামে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক নিজস্ব ভবনটি ঢাকাতে না নিয়ে অবিলম্বে চট্টগ্রামে চালু করার জোর দাবি জানানো হবে।
এই কর্মসূচির পোস্টারে চট্টগ্রামের সর্বস্তরের ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, আইনজীবী, ছাত্র-জনতা ও সচেতন নাগরিক সমাজকে যথাসময়ে উপস্থিত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। আন্দোলনকারীদের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি—"বিপিসি চট্টগ্রামেই থাকবে, চট্টগ্রামের অধিকার চট্টগ্রামেই থাকবে।" বাণিজ্যিক রাজধানীর মর্যাদা রক্ষা এবং আঞ্চলিক বৈষম্য বন্ধে এই প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
আয়োজকদের পক্ষে মুনীর চৌধুরী এক বিবৃতিতে বলেন, চট্টগ্রামে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর আধুনিক নিজস্ব ভবন প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও সেটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না করে ‘লিয়াজোঁ অফিস’-এর আড়ালে পুরো কার্যালয় ঢাকায় সরিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টা চলছে। এটি চট্টগ্রামের ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ মর্যাদার ওপর চরম আঘাত এবং সুস্পষ্ট আঞ্চলিক বৈষম্যের বহিঃপ্রকাশ।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অতীতেও একের পর এক ব্যাংক, বীমা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় স্থানান্তরের মাধ্যমে দেশের প্রধান বন্দরনগরীকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করা হয়েছে।
এবার বিপিসিকে সরিয়ে নেওয়ার যেকোনো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত চট্টগ্রামের জনগণ কোনোভাবেই মেনে নেবে না এবং সর্বস্তরের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এই অপচেষ্টা প্রতিহত করা হবে।
উক্ত মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচিতে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, আইনজীবী, ছাত্র-জনতা ও সচেতন নাগরিক সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে যথাসময়ে উপস্থিত থেকে সংহতি প্রকাশের জন্য উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়েছে।
যোগাযোগ ও সৌজন্যে:
সচেতন চট্টলাবাসী’র পক্ষে
মুনীর চৌধুরী
ও
নোমান উল্লাহ বাহার।
বিস্তারিত জানতে-
🌐https://jantechaijanatechai.com
📧 mchypd@gmail.com