নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে: পুলিশ বাহিনীর সংস্কার ও জনবান্ধব রূপান্তর: রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার এখনই সময়
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শান্তি, শৃঙ্খলা ও নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রাথমিক দায়িত্ব পুলিশ বাহিনীর। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পুলিশ বাহিনী দীর্ঘকাল ধরে এক গভীর কাঠামোগত ও মনস্তাত্ত্বিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, মব ভায়োলেন্সের আতঙ্ক, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং জনগণের সাথে তৈরি হওয়া আস্থার দূরত্ব—সব মিলিয়ে বাহিনীর সদস্যরা এক চরম সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর। একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে হলে পুলিশ বাহিনীকে এই অবস্থা থেকে টেনে তোলা এবং তার আমূল সংস্কার এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।পুলিশের বর্তমান মনস্তাত্ত্বিক সংকটের মূলে রয়েছে বহুমাত্রিক আস্থাহীনতা। দীর্ঘ সময় ধরে এই বাহিনীকে শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার ফলে সাধারণ মানুষের সাথে তাদের একটি বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বিগত দিনগুলোর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের খেসারত এখন দিতে হচ্ছে মাঠপর্যায়ের সাধারণ পুলিশ সদস্যদের। ফলস্বরূপ, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ‘মব ভায়োলেন্স’ বা গণসহিংসতার শিকার হওয়ার ভয় তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেকোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ভিডিও ট্রায়াল’ বা একপেশে সমালোচনার আতঙ্কে মাঠের কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। এই স্থবিরতার সুযোগ নিয়ে সমাজজুড়ে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত, ছিনতাই, ডাকাতি এবং চাঁদাবাজির মতো অপরাধ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।এই বাহ্যিক সংকটের পাশাপাশি বাহিনীর ভেতরে তৈরি হয়েছে অদৃশ্য বিভাজন। বিগত বছরগুলোতে পদোন্নতি, পদায়নকে কেন্দ্র করে যে তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ হয়েছিল, তা এখন গ্রুপিংয়ের রূপ নিয়েছে। সহকর্মীদের মধ্যেই একে অপরের প্রতি আস্থার তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে, যা চেইন অব কমান্ড বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা মানার ক্ষেত্রে এক ধরনের শিথিলতা তৈরি করছে। একটি শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরম উদ্বেগজনক।এই সংকট থেকে উত্তরণ কেবল উপরিভাগের কিছু প্রশাসনিক পরিবর্তনের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন পুলিশ বাহিনীকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা। পুলিশ কোনো নির্দিষ্ট দলের বা গোষ্ঠীর নয়, বরং তারা রাষ্ট্রের এবং জনগণের—এই মূলমন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পুলিশ আইনি কাঠামো অনুযায়ী স্বাধীনভাবে কাজ করবে এবং তাদের জবাবদিহিতা থাকবে কেবল আইন ও সংবিধানের কাছে। একই সাথে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে চেইন অব কমান্ড পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা জরুরি।নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন তখনই বাস্তব হবে যখন পুলিশ ও জনগণের দূরত্ব কমে পারস্পরিক আস্থা ফিরে আসবে। পুলিশকে শাস্তিমূলক বা দমনমূলক বাহিনী হিসেবে নয়, বরং জনগণের সেবক ও বন্ধু হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। রাষ্ট্র, সমাজ ও দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থেই পুলিশ বাহিনীর এই জনবান্ধব রূপান্তর ও সংস্কার প্রক্রিয়া এখনই শুরু করা উচিত।