পুলিশের সুখ দুঃখ –
আড়াই লাখ পুলিশের নেই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা-কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগ আছে, কিন্তু স্থায়ী চিকিৎসক নেই।
“মুনীর চৌধুরী”
পুলিশের সুখ দুঃখ –
আড়াই লাখ পুলিশের নেই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা-কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগ আছে, কিন্তু স্থায়ী চিকিৎসক নেই।
দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও চাপের মধ্যে কাজ করে যেতে হয় পুলিশ সদস্যদের।
গত ১৯ জুন পটুয়াখালী পুলিশ ব্যারাক থেকে নারী কনস্টেবল তৃষা বিশ্বাসের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মাত্র দুই বছর আগে পুলিশে যোগদান করা এই তরুণীর কক্ষ থেকে পাওয়া যায় একটি চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র। সেখানে লেখা ছিল—আত্মহত্যার প্রবণতা, বিষণ্নতা ও দুশ্চিন্তা। চিকিৎসক তাকে হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দিলেও তিনি কাউকে কিছু জানাননি।
এই ঘটনা উন্মোচন করেছে বাংলাদেশ পুলিশের একটি নীরব সংকটের চিত্র—আড়াই লাখ পুলিশ সদস্যের জন্য নেই একজনও স্থায়ী মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ।
পটভূমি
তৃষা বিশ্বাস ২০২৩ সালের নভেম্বরে পুলিশে যোগদান করেন। পটুয়াখালীতে এটাই ছিল তাঁর প্রথম পোস্টিং। সহকর্মীদের মতে, তিনি ছিলেন চুপচাপ ও পরিশ্রমী। কিন্তু কেউ জানতেন না, তিনি মানসিক চাপে ভুগছেন।
তাঁর কক্ষ থেকে পাওয়া চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রে উল্লেখ ছিল—তিনি বিষণ্নতা (depression), উদ্বেগ (anxiety) এবং আত্মহত্যার প্রবণতা (suicidal tendencies) নিয়ে ভুগছেন। চিকিৎসক তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তৃষা না হাসপাতালে ভর্তি হন, না বিষয়টি কাউকে জানান। তিনি যে ওষুধ সেবন করতেন, তাও পুলিশকে অবহিত করেননি।
সরেজমিন পর্যবেক্ষণ
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পটুয়াখালী পুলিশ ব্যারাকে মোট ৫০০ জনেরও বেশি পুলিশ সদস্য কর্মরত আছেন। কিন্তু সেখানে নেই কোনো মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র বা কাউন্সেলিং ব্যবস্থা।
ব্যারাকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা চাইলেও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা নেই। আমাদের হাতে কোনো সাইকিয়াট্রিস্ট বা কাউন্সেলর নেই।’
ঢাকার রাজারবাগে অবস্থিত কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে একটি মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগ আছে। কিন্তু বিভাগটিতে নেই কোনো স্থায়ী চিকিৎসক। শুধুমাত্র আউটসোর্সিং-এর মাধ্যমে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দিয়ে অস্থায়ীভাবে কাজ চালানো হচ্ছে।
তথ্য-উপাত্ত
অনুসন্ধানে জানা যায়
✓ বাংলাদেশ পুলিশের মোট সদস্য সংখ্যা: আড়াই লাখের কাছাকাছি
✓ স্থায়ী সাইকিয়াট্রিস্ট: নেই একজনও
✓ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগ: আছে, কিন্তু স্থায়ী চিকিৎসক নেই
✓ আউটসোর্সিং-এর মাধ্যমে: একজন সাইকিয়াট্রিস্ট (অস্থায়ী)
✓ জেলা পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য ইউনিট: ৫৯টি জেলায় পুলিশ চিকিৎসা সুবিধা থাকলেও কোনোটিতেই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেই
সাম্প্রতিক আত্মহত্যার ঘটনা
তৃষা বিশ্বাসের ঘটনা একক নয়। গত কয়েক বছরে পুলিশ বাহিনীতে আত্মহত্যার একাধিক ঘটনা ঘটেছে:
•সম্রাট বিশ্বাস (২৭), খুলনা রেলওয়ে পুলিশের কনস্টেবল—নিজের সার্ভিস ওয়েপন দিয়ে আত্মহত্যা করেন। পারিবারিক সমস্যার কারণে তিনি বিষণ্নতায় ভুগছিলেন।
রুবেল মিয়া*, পুলিশ কনস্টেবল (১০ জুন ২০২৪)—ফেসবুকে ‘The End’ লিখে ১৪০টি ঘুমের ওষুধ খান। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
কাউসার আহমেদ*কনস্টেবল (৮ জুন ২০২৪)—গুলশানে প্যালেস্টাইন দূতাবাসে কর্তব্যরত অবস্থায় সহকর্মী মনিরুলকে গুলি করে হত্যা করেন। তাঁর পরিবার দাবি করে যে তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সংকটে ভুগছিলেন।
মোহাম্মদ রনি (২৫ মে ২০২৩)—বনানী, ঢাকায় নিজের issued firearm দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
সাইফুল ইসলাম*(২১ জুলাই ২০২১)—মুজিবনগর, মেহেরপুরে কর্তব্যরত অবস্থায় আত্মহত্যা করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
**ড. তাওহিদুল হক**, সহযোগী অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুলিশ সদস্যরা যে চাপের মধ্যে কাজ করে, বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের পুলিশ, তা সবসময় চ্যালেঞ্জিং। মানুষের সেবা করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যরা নিজেরাই অনেক সময় মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন।’
তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশ বাহিনীর মধ্যে সাইকিয়াট্রিস্ট থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত দেশগুলোতে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে সাইকিয়াট্রিস্ট থাকে।’
সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম* বলেন, ‘পুলিশ সদস্যদের অনেক সময় তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। দীর্ঘ সময় ডিউটি এবং পরিবার থেকে দূরে থাকার কারণে বিষণ্নতা তৈরি হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এটি আত্মহত্যার দিকেও নিয়ে যেতে পারে।’
‘তাই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পুলিশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ হাসপাতালে সাইকিয়াট্রিস্ট নিয়োগ দিতে হবে। ইউনিট কমান্ডারদের অধীনস্থদের মানসিক অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা উচিত,’ যোগ করেন তিনি।
*মোহাম্মদ সাঈদুর রহমান* পরিচালক, কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল পরিচালক বলেন, ‘পুলিশ সদস্যরা বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে তাদের দায়িত্ব পালন করে। তাদের মানসিক সুস্থতার প্রতি আরও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে একটি মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগ আছে। কিন্তু সেখানে স্থায়ী জনবল নেই। প্রতিটি জেলায় স্থায়ী জনবলসহ মানসিক স্বাস্থ্য ইউনিট স্থাপনেরও প্রয়োজন রয়েছে।’
পুলিশ সদস্যদের বক্তব্য
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পুলিশ সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে আমরা টানা ডিউটি করছি। নির্বাচনী ডিউটিও ছিল। টানা ৬ মাস কোনো ছুটি বা পর্যাপ্ত বিশ্রাম ছাড়া কাজ করেছি। ঈদুল ফিতর পরিবারের সাথে কাটাতে পারিনি।’
‘আমাদের কাজ মানুষের সাথে সম্পর্কিত। এক পক্ষের সমস্যা সমাধান করলে অন্য পক্ষ অসন্তুষ্ট হয়। সবাইকে খুশি রাখা অসম্ভব, তাই আমরা মানসিক চাপে থাকি,’ বলেন তিনি।
মানসিক চাপের কারণসমূহ
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পুলিশ সদস্যদের মানসিক চাপের পেছনে কয়েকটি মূল কারণ রয়েছে:
১. পেশাগত চাপ:
• দীর্ঘ কর্মঘণ্টা (কোনো কোনো ক্ষেত্রে টানা ৬ মাস ছুটি ছাড়া ডিউটি)
• উচ্চঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে অংশগ্রহণ
• অপরাধীদের সাথে নিয়মিত সংঘাত
২. প্রশাসনিক চাপ:
• পদোন্নতি ও ছুটির অভাব
• ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কঠোর আচরণ
• পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব
৩. ব্যক্তিগত চাপ:
• পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা
• পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও আর্থিক চাপ
• সামাজিক প্রত্যাশার বোঝা
উন্নত দেশগুলোতে পুলিশ সদস্যরা উচ্চঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের পর নিয়মিত কাউন্সেলিং পেয়ে থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশে এমন কোনো ব্যবস্থা নেই।
পুলিশের দাবিসমূহ
পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬ (১০ মে থেকে শুরু) উপলক্ষে পুলিশ বাহিনী নতুন সরকারের কাছে নিম্নলিখিত দাবগুলো উত্থাপন করতে যাচ্ছে:
১. দ্রুত সাইকিয়াট্রিস্ট নিয়োগ
২. বিভাগভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবাসমৃদ্ধ হাসপাতাল স্থাপন
৩. পুলিশ সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা
উপসংহার
তৃষা বিশ্বাসের মৃত্যু কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়—এটি বাংলাদেশ পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার প্রতিফলন। আড়াই লাখ পুলিশ সদস্যের মানসিক সুস্থতার দায়িত্ব নেই কারো। এই শূন্যস্থান পূরণ না করলে এমন ঘটনা বারবার ঘটবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুলিশ বাহিনীর মধ্যে স্থায়ী সাইকিয়াট্রিস্ট নিয়োগ, নিয়মিত কাউন্সেলিং ব্যবস্থা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।