বিপিসি ও জ্বালানি মন্ত্রালয় চুরে চুরে খালাত ভাই :৯ হাজার কোটি টাকার হিসাবের গড়মিল:সিস্টেম লসের আড়ালে তেল চুরি জবাবদিহিতাহীনতায় দেশের জ্বালানি খাত।
অডিট আপত্তি ও অব্যবস্থাপনার জালে জ্বালানি খাত: বিপিসি ও মন্ত্রণালয়ে স্বচ্ছতার অভাব
বিশেষ প্রতিনিধি |
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান চালিকাশক্তি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। তবে বছরের পর বছর ধরে এই দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, অডিট আপত্তি, এবং তেল আমদানিতে অস্বচ্ছতার নানা অভিযোগ উঠছে। সরকারি বিভিন্ন অডিট ও স্বাধীন তদন্তে বারবার উঠে এসেছে হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক অব্যবস্থাপনার চিত্র, যা সামগ্রিকভাবে দেশের জ্বালানি খাতকে ঝুঁকিতে ফেলছে।
হাজার কোটি টাকার অডিট আপত্তি ও হিসাবের গড়মিল
মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) বিভিন্ন বার্ষিক প্রতিবেদনে বিপিসির শত শত অডিট আপত্তির বিষয়টি বারবার সামনে এসেছে। ব্যাংকে জমা রাখা টাকার সুদ হিসাবে অনিয়ম, জ্বালানি তেল বিক্রির টাকা সরকারি কোষাগারে সময়মতো জমা না দেওয়া এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের প্রমাণ মিলেছে। যথাযথ ভাউচার ও রসিদ ছাড়া কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের কারণে হিসাবের এই স্বচ্ছতাহীনতা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিকে ত্বরান্বিত করছে বলে মনে করেন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
তেল আমদানি ও প্রিমিয়ামে অস্বচ্ছতা
বিপিসির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি হলো আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি তেল আমদানির প্রক্রিয়া। দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তির বাইরে স্পট মার্কেট (খোলা বাজার) থেকে তেল কেনার ক্ষেত্রে অনেক সময় অসংগতি দেখা যায়। তেল আমদানির প্রিমিয়াম (পরিবহন ও অন্যান্য খরচ) নির্ধারণে আন্তর্জাতিক নিয়মের চেয়ে বেশি অর্থ পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে, যার ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বিপুল অর্থ অপচয় হয়। এই বাড়তি খরচের দায় শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণের ওপর জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে চাপানো হয়।
সিস্টেম লস নাকি তেল চুরি?
পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল পরিবহন এবং ডিপোগুলোতে তেল সংরক্ষণের সময় প্রতি বছর এক বিশাল পরিমাণ ‘সিস্টেম লস’ বা ঘাটতি দেখানো হয়। তবে একাধিক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, এই ঘাটতির আড়ালে মূলত জ্বালানি তেল চুরির সিন্ডিকেট সক্রিয়। বিভিন্ন ডিপো থেকে তেল গায়েব হওয়া এবং পরবর্তীতে তা কালোবাজারে বিক্রি করে দেওয়ার পেছনে ভেতরের কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের যোগসাজশের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয় বৃদ্ধি
জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও বিপিসির অধীনে নেওয়া বিভিন্ন মেগা প্রকল্প, যেমন—ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণ বা সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে পাইপলাইন স্থাপন (SPM) প্রকল্পের কাজ বছরের পর বছর ধরে পিছিয়েছে। দফায় দফায় সময় বাড়ানোর ফলে প্রকল্পগুলোর নির্মাণ ব্যয় মূল বরাদ্দের চেয়ে কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। সঠিক তদারকির অভাব এবং ঠিকাদার নিয়োগে অনিয়মই এই দীর্ঘসূত্রতার মূল কারণ বলে মনে করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিপিসি এবং জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে পূর্ণ জবাবদিহিতা ও ডিজিটাল অটোমেশন নিশ্চিত করা না গেলে এই অনিয়ম রোধ করা সম্ভব নয়। তেলের দাম নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় ফর্মুলা চালু করা হলেও, কেনাকাটা ও ব্যবস্থাপনার ভেতরের সুশাসন নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি। একটি স্বাধীন জ্বালানি কমিশন গঠন করে নিয়মিত গণশুনানি ও নিরপেক্ষ অডিটের মাধ্যমেই কেবল এই খাতের দুর্নীতি কমিয়ে আনা সম্ভব।