কঠোরতার আড়ালে কোমল মন: পুলিশের ভেতরের অচেনা গল্প.
বিশেষ প্রতিনিধি
সাংবাদিক মুনীর চৌধুরীর জনপ্রিয় কলাম “পুলিশের সুখ-দুঃখ” এবং অনুসন্ধানী কলামও প্রোগ্রাম “জানতে চাই জানাতে চাই”-এর মূল প্রতিপাদ্যকে ভিত্তি করে একটি বিস্তারিত বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।
“শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, প্রগতি”—এই তিন মূলমন্ত্র বুকে নিয়ে যে বাহিনীটি চব্বিশ ঘণ্টা টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, তারা হলো ‘বাংলাদেশ পুলিশ’। কিন্তু এই ঝলমলে পোশাক এবং কড়া শৃঙ্খলার আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে কনস্টেবল থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের সিংহভাগ পুলিশ সদস্যের সীমাহীন কষ্ট, ক্ষোভ আর বঞ্চনা।
সাংবাদিক মুনীর চৌধুরীর দীর্ঘদিনের অনুসন্ধানী কলাম ‘পুলিশের সুখ-দুঃখ’ এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করে পুলিশের ভেতরের সেই মানবিক ও কাঠামোগত সমস্যাগুলোর একটি এক্স-রে রিপোর্ট এখানে তুলে ধরা হলো।
১. ৯০ শতাংশের আবাসন সংকট: ‘ব্যারাক যেন এক নরক’
একটি বড় জেলা শহরের পুলিশ লাইন্স ব্যারাকে রাত ২টায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাত্র ১০ জন থাকার মতো একটি স্যাঁতসেঁতে রুমে গাদাগাদি করে ঘুমাচ্ছেন ৩০ থেকে ৩৫ জন কনস্টেবল।
* বাস্তবতা: মাঠপর্যায়ের প্রায় ৯০ শতাংশ পুলিশ সদস্যই তীব্র আবাসন সংকটে ভুগছেন।
* পারিবারিক দূরত্ব: আবাসন সংকটের কারণে প্রায় ৮০% সদস্য নিজেদের পরিবার-পরিজন থেকে বছরের পর বছর দূরে থাকতে বাধ্য হন।
* ভাড়ার বোঝা: বাইরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকার মতো পর্যাপ্ত ‘বাড়ি ভাড়া ভাতা’ তারা পান না, যার ফলে সামান্য বেতনের একটা বড় অংশই চলে যায় নিম্নমানের বাসা ভাড়ার পেছনে।
২. ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টার ডিউটি: নেই কোনো ‘শিফট’ বা ‘ওভারটাইম’
পৃথিবীর সব পেশায় কর্মঘণ্টা সুনির্দিষ্ট হলেও পুলিশের কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই।
* অমানুষিক চাপ: একজন সাধারণ কনস্টেবল বা এসআই-কে দিনে গড়ে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা টানা দায়িত্ব পালন করতে হয়। রাজনৈতিক কর্মসূচি, উৎসব বা ভিআইপি মুভমেন্ট থাকলে এই চাপ আরও বাড়ে।
* বিশ্রামহীন জীবন: সপ্তাহে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ছুটি নেই। টানা ডিউটির পর ব্যারাকে ফিরে একটু শান্তিতে ঘুমানোর পরিবেশও মেলে না। অথচ, এই অতিরিক্ত খাটুনির জন্য কোনো ওভারটাইম ভাতা বা শিফটিং ডিউটির সুনির্দিষ্ট কোনো ফ্রেমওয়ার্ক এত বছর ধরে তৈরি করা হয়নি।
৩. পদোন্নতি বঞ্চনা এবং ‘সুপারনিউমারারি’ জটিলতা
পুলিশের নিচের সারির অফিসারদের (কনস্টেবল, এএসআই, এসআই) মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষোভের জায়গা হলো ক্যারিয়ারের স্থবিরতা।
* একই পদে অবসরে: একজন সদস্য কনস্টেবল বা এসআই হিসেবে যোগ দিয়ে ২০-২৫ বছর পর একই পদে থেকে বা মাত্র এক ধাপ পদোন্নতি পেয়ে অবসরে যাচ্ছেন।
* বৈষম্য: বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য পদোন্নতি বা ‘সুপারনিউমারারি’ (পদ না থাকলেও পদোন্নতি) সুবিধা যেভাবে কাজ করে, নন-ক্যাডার বা মাঠপর্যায়ের উপ-পরিদর্শকদের ক্ষেত্রে তা চরম আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে থাকে। যোগ্য হয়েও বছরের পর বছর পদোন্নতি না পেয়ে অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
৪. মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যয়: বাড়ছে চরম অবসাদ (Depression)
পাবমেড (PubMed) ও বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বাংলাদেশ পুলিশের প্রায় ২৯.৬% সদস্য তীব্র বিষণ্নতা (Severe Depression) এবং ৪৮.৭% সদস্য তীব্র দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগে ভোগেন।
* পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা: সন্তানের অসুস্থতা বা স্ত্রীর বিপদেও ছুটি না পাওয়া, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কথায় কথায় গালমন্দ বা তিরস্কার (Reprimand) শোনা পুলিশের ভেতরের ক্ষোভকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়।
* কাউন্সেলিংয়ের অভাব: এই বিশাল মানসিক চাপ সামলানোর জন্য জেলা পর্যায়ে কোনো স্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং বা মেন্টাল হেলথ সাপোর্ট সিস্টেম নেই।
* ৫. রেশন এবং চিকিৎসার নিম্নমান
রেশনের চাল, ডাল ও তেলের মান নিয়ে মাঠপর্যায়ের পুলিশদের মধ্যে দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভ রয়েছে। এছাড়া বিভাগীয় বা জেলা পুলিশ হাসপাতালগুলোর আধুনিকায়নের অভাব স্পষ্ট। কোনো পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হলে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল (সিপিএইচ) ছাড়া ঢাকার বাইরে উন্নত চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।
সমাধানের আলো: সরকারের নতুন উদ্যোগ ও প্রস্তাবনা
সাংবাদিক মুনীর চৌধুরীসহ বিভিন্ন মহলের ক্রমাগত লেখালেখি এবং ২০২৪ পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতির পর, বর্তমান সরকার পুলিশের এই ‘সুখ-দুঃখ’ আমলে নিতে শুরু করেছে।
* ১৪ কোটি টাকার মহাপরিকল্পনা: পুলিশের মনস্তাত্ত্বিক উন্নয়ন, উদ্বুদ্ধকরণ এবং মাঠপর্যায়ে জনবান্ধব পুলিশিং গড়তে সরকার প্রায় ১৪ কোটি টাকার একটি বিশেষ প্রকল্প প্রস্তাব করেছে।
* কমিউনিটি পুলিশিং পুনর্গঠন: ৬৪ জেলায় অপরাধের উৎস মূল উপড়ে ফেলতে এবং পুলিশের ওপর কাজের চাপ কমাতে কমিউনিটি পুলিশিং কমিটিকে
* নতুনভাবে সক্রিয় করা হচ্ছে।
* সংস্কারের দাবি: বর্তমানে পুলিশের পক্ষ থেকে ৮ দফা ও ১১ দফার মতো সংস্কার প্রস্তাবনা এসেছে, যার মধ্যে কর্মঘণ্টা ৮ ঘণ্টায় নামানো, শিফটিং ডিউটি চালু, আবাসন নিশ্চিতের জন্য ফান্ড বরাদ্দ এবং লটারির মাধ্যমে ফেয়ার বদলি পদ্ধতি অন্যতম।
প্রতিবেদকের শেষ কথা:
জনগণকে সেবা দিতে হলে যিনি সেবা দেবেন তাঁর নিজের ভালো থাকা জরুরি। পোশাকের ভেতরের মানুষটিকে ক্ষুধার্ত, ঘুমহীন এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত রেখে একটি সুস্থ ও দুর্নীতিমুক্ত ‘জনবান্ধব পুলিশ’ গঠন করা অসম্ভব। তাই পুলিশের এই যৌক্তিক দুঃখগুলো দূর করাই হোক পুলিশ সংস্কারের প্রথম ধাপ।