পলিথিনের নিচে ঢাকা পড়েছে হাজার কোটির মেগা প্রকল্প: অস্তিত্ব সংকটে চট্টগ্রামের খাল:চাক্তাইয়ে ‘ওপেন সিক্রেট’ সাম্রাজ্য: কার ইশারায় চলে এই পলিথিন সিন্ডিকেট?
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারের প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার চারটি মেগা প্রকল্প।
মাঝে মধ্যে লোক দেখানো অভিযান চলমান থাকলেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সুফল। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে নগরের প্রধান বাণিজ্যিক হাব চাক্তাই, রাজাখালী ও ওসমানীয়া গলি নিয়ন্ত্রণ করছে একটি শক্তিশালী পলিথিন সিন্ডিকেট। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ১০/১২ জনের এই চক্রের কারণে প্রতিদিন টন টন নিষিদ্ধ পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য গিয়ে পড়ছে চাক্তাই ও রাজাখালী খালে। ফলে খালের তলদেশে তৈরি হয়েছে পলিথিনের অভেদ্য আস্তরণ, যা মেগা প্রকল্পের সুফলকে পুরোপুরি নস্যাৎ করে দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজারকে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ওসমানীয়া গলির ‘ওপেন সিক্রেট’ সাম্রাজ্য
অনুসন্ধানে জানা যায়, চাক্তাই ও রাজাখালীর ঘিঞ্জি গলি, বিশেষ করে ওসমানীয়া গলির নামহীন গুদামগুলো নিষিদ্ধ পলিথিন মজুত ও দেশব্যাপী সরবরাহের প্রধান ট্রানজিট রুট। স্থানীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে, যুবলীগ নেতা মুরশেদ গং-এর ১০/১২ জনের একটি চক্র এই পুরো সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে স্থানীয় সাধারণ ব্যবসায়ী বা বাসিন্দারা এদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পান না। এই চক্রটি প্রতিদিন চট্টগ্রাম শহরসহ আশেপাশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় লাখ লাখ টাকার নিষিদ্ধ পলিথিন পাচার করছে।
পলিথিন বর্জ্যের স্তূপে অস্তিত্ব সংকট
শুধু চাক্তাই বা রাজাখালী নয়, পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যের তীব্র স্তূপে চট্টগ্রাম নগরের বেশিরভাগ প্রাকৃতিক খালই এখন অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে।
এই বর্জ্য ড্রেন ও নালা হয়ে সরাসরি খালে গিয়ে পড়ছে। নিয়মিত সংস্কার ও দীর্ঘমেয়াদি ড্রেজিংয়ের অভাবে খালের ধারণক্ষমতা এখন শূন্যের কোঠায়।
অসচেতনতা ও সংস্কারহীনতায় ডুবছে নগরী
স্থানীয় বাসিন্দাদের চরম অসচেতনতা এবং যত্রতত্র প্লাস্টিক ফেলার অভ্যাসের কারণে মেগা প্রজেক্টের ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক শুরুতেই মার খাচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সেবা সংস্থাগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। ফলে বর্ষা মৌসুম তো দূর, সামান্য বৃষ্টি হলেই পুরো চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ, আসাদগঞ্জসহ নগরের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি টাকার পণ্য গুদামেই পচে নষ্ট হচ্ছে।
মেগা প্রকল্পের বুকে পলিথিনের ছুরি
চট্টগ্রামের কোমর সমান পানি থেকে রেহাই পেতে চাক্তাই খালের মুখে মেগা রেগুলেটর, স্লুইস গেট ও শক্তিশালী পাম্প বসানো হয়েছে। কিন্তু চাক্তাই ও রাজাখালী খালের ভাসমান পলিথিনের কারণে এই রেগুলেটরগুলোর কার্যকারিতা নষ্ট হচ্ছে। পলিথিনের স্তূপে জ্যাম হয়ে যাচ্ছে পানির পাম্প।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে খালের তলদেশে। বছরের পর বছর ফেলে দেওয়া পলিথিন জমে খালের তলদেশে ২ থেকে ৭ মিটার গভীর একটি শক্ত স্তর তৈরি করেছে। এর ফলে মাটি কাটার ড্রেজারও খালের তলদেশ খনন করতে পারছে না। চাক্তাই ও রাজাখালী খাল বেয়ে এই পলিথিন গিয়ে পড়ছে কর্ণফুলী নদীতে, যার ফলে [নদীর ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের কাজও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
অনিয়ম ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের দ্বিমুখী চাপ
চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ ও আসাদগঞ্জে প্রায় ৬ হাজার দোকান, গুদাম ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং কয়েক হাজার বহুতল ভবন রয়েছে। প্রচলিত ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অমান্য করে, ভবন নির্মাণের নির্ধারিত জায়গা না ছেড়ে এখানে একের পর এক ভবন তোলা হয়েছে। একদিকে ভবনের কারণে পানি নামার স্বাভাবিক পথ অবরুদ্ধ, অন্যদিকে ড্রেন ও নালাগুলো পলিথিনে ঠাসা।
প্রশাসনের ভূমিকা ও বিশেষজ্ঞ অভিমত
পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে ওসমানীয়া গলিতে অভিযান চালিয়ে হাজার হাজার কেজি পলিথিন জব্দ ও জরিমানা করলেও সিন্ডিকেট থামানো যাচ্ছে না। অভিযানের পর কিছুদিন বন্ধ থাকলেও পর্দার আড়ালের মূল হোতারা ধরাছোঁয়া বৈরী থাকায় পুনরায় সচল হয় এই অবৈধ ব্যবসা।
নগরমহল ও পরিবেশবিদদের মতে, কোটি কোটি টাকা খরচ করে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও কোনো লাভ হবে না, যদি না জলাবদ্ধতার মূল শত্রু পলিথিনের উৎস বন্ধ করা যায়। চাক্তাই-রাজাখালীর এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটকে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলা এবং নদী ও খালের তলদেশ থেকে পলিথিনের স্তর দ্রুত অপসারণ করাই এখন চট্টগ্রামকে বাঁচানোর একমাত্র উপায়।