বর্ষা এলেই জোড়াতালি: চসিকের প্রায় ২০০ কিলোমিটার সড়ক এখন মরণফাঁদ.
১০ বছরে সড়কে ব্যয় প্রায় ৪,৯৪০ কোটি টাকা; এবার সংস্কারে নতুন প্রাক্কলন ৩৪৭.৮২ কোটি
নিজস্ব প্রতিবেদক |
গত এক দশকে সড়ক উন্নয়ন ও সংস্কার খাতে প্রায় ৪ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। তবে সাম্প্রতিক টানা এক সপ্তাহের ভারী বর্ষণের পর নগরের বিভিন্ন এলাকার সড়কে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা আবারও সড়কের স্থায়িত্ব ও নির্মাণমান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
চসিকের প্রকৌশল বিভাগের একটি সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, নগরের ছয়টি অঞ্চলে মোট ১৯৬ দশমিক ৭৯ কিলোমিটার সড়ক সম্পূর্ণ বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব সড়ক সংস্কারে প্রাথমিকভাবে ৩৪৭ কোটি ৮২ লাখ টাকার প্রাক্কলন প্রস্তুত করা হয়েছে।
এদিকে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে জরুরি সড়ক মেরামতের জন্য চসিকের বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ২২ কোটি টাকা। ফলে প্রয়োজনীয় অর্থের ঘাটতি পূরণে স্থানীয় সরকার বিভাগ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের কাছে ২৬০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেছে সিটি কর্পোরেশন।
নথিতে যা পাওয়া গেছে
প্রকৌশল বিভাগের তথ্য অনুযায়ী
– ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের দৈর্ঘ্য: ১৯৬.৭৯ কিলোমিটার।
– সম্ভাব্য সংস্কার ব্যয়: ৩৪৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা।
– জরুরি প্যাচওয়ার্কের বিদ্যমান বরাদ্দ: ২২ কোটি টাকা।
চসিকের কর্মকর্তারা বলছেন, অতিরিক্ত বরাদ্দ না পাওয়া পর্যন্ত সব ক্ষতিগ্রস্ত সড়কে দ্রুত সংস্কার কাজ শুরু করা সম্ভব হবে না।
কেন দ্রুত নষ্ট হচ্ছে সড়ক?
সড়ক প্রকৌশল সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে কয়েকটি কারণ সামনে এসেছে।
প্রথমত, দীর্ঘসময় সড়কের ওপর পানি জমে থাকায় বিটুমিনের বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে। কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় ভারী বর্ষণের সময় অনেক সড়কে পানি দীর্ঘসময় অবস্থান করে, যা পিচ উঠে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
দ্বিতীয়ত, নির্মাণসামগ্রীর মান ও কাজের গুণগত মান নিয়ে অতীতেও বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রতিবারই নিয়ম অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করার দাবি করা হয়েছে।
তৃতীয়ত, অর্থবছরের শেষ দিকে কিংবা বর্ষা মৌসুমের শুরুতে তড়িঘড়ি করে কার্পেটিংয়ের কাজ করার প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, প্রতিকূল আবহাওয়ায় বিটুমিনের কাজ করলে তার স্থায়িত্ব কমে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞের মত
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের এক অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নিচু এলাকায় যেখানে নিয়মিত পানি জমে, সেখানে বিটুমিনের পরিবর্তে রিইনফোর্সড সিমেন্ট কংক্রিট (আরসিসি) সড়ক নির্মাণ অধিক টেকসই হতে পারে। পাশাপাশি জলাবদ্ধতা নিরসন, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
চসিকের বক্তব্য
চসিকের প্রকৌশল বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ভারী বর্ষণ এবং ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ওজনের যানবাহন চলাচলের কারণে অনেক সড়ক দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো টেকসইভাবে সংস্কারের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
জবাবদিহির দাবি
নগরবাসীর একাংশের দাবি, অতীতের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোর অভিজ্ঞতা বিবেচনায় এবার সংস্কার কার্যক্রমে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, টেন্ডার প্রক্রিয়া, নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ন্ত্রণ, কাজের তদারকি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে স্বাধীন নজরদারি জোরদার করা হলে সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবছর একই ধরনের মেরামতের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে টেকসই সড়ক নির্মাণ এবং জলাবদ্ধতা নিরসনই হতে পারে সমস্যার স্থায়ী সমাধান।