মন্ত্রীর আশ্বাস অমান্য করে বিপিসি সরানোর অপচেষ্টা বিতর্কিত চেয়ারম্যানের অপসারণ:ঢাকা লিয়াজোঁ অফিসের আড়ালে সিন্ডিকেট: বিপিসি চেয়ারম্যান ওএসডি, স্বস্তিতে চট্টগ্রাম।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন-
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় স্থানান্তরের একটি সুগভীর ও গোপন চক্রান্ত নস্যাৎ হয়ে গেছে। সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক গুরুত্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে স্বৈরাচারী কায়দায় এই অপচেষ্টা চালিয়েছিলেন বিপিসির সদ্য resignation/অপসারিত চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান। তবে চট্টগ্রাম ও ঢাকার একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে প্রাপ্ত নথিপত্র এবং অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য—এই স্থানান্তরের পেছনে কেবল প্রশাসনিক সুবিধাই নয়, বরং কোটি কোটি টাকার জ্বালানি তেল ক্রয়ের সরাসরি নীতি (Direct Purchase) এবং মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে চেয়ারম্যানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও বড় ধরনের আর্থিক স্বার্থ জড়িত ছিল।
শেষ পর্যন্ত তীব্র গণঅসন্তোষ এবং গণমাধ্যমের কড়া নজরদারির মুখে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক জরুরি আদেশে বিতর্কিত এই চেয়ারম্যানকে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করায় স্বস্তি ফিরেছে চট্টগ্রামের সচেতন মহলে।
মন্ত্রীর ঘোষণা বনাম চেয়ারম্যানের গোপন চিঠি: পর্দার আড়ালের খেলা
অনুসন্ধানে জানা যায়, নাগরিক উন্নয়ন সংগঠন “সচেতন চট্টলাবাসী”র আন্দোলনের মুখে
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী চট্টগ্রামের এক অনুষ্ঠানে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, দেশের প্রধান বাণিজ্যিক বন্দর এবং জ্বালানি হাব হিসেবে বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামেই থাকবে। কিন্তু মন্ত্রীর এই জনসমক্ষ গ্যারান্টির মাত্র ১৯ দিন পর, চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে একটি ইতিবাচক সুপারিশ সংবলিত আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠান। চিঠিতে বিপিসির মূল প্রশাসনিক কার্যক্রম চট্টগ্রামে রাখা ‘অলাভজনক ও অকার্যকর’ দাবি করে তা স্থায়ীভাবে ঢাকায় স্থানান্তরের যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, “চট্টগ্রামের সার্সন রোডে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে বিপিসির দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক নিজস্ব বহুতল ভবন নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হওয়ার পরও চেয়ারম্যান কেন ঢাকায় ভাড়া ভবনে লিয়াজোঁ অফিসের আড়ালে মূল কার্যালয় সরাতে চাচ্ছিলেন, তা নিয়ে খোদ বিপিসির ভেতরেই চরম অসন্তোষ ছিল।”
সরাসরি তেল ক্রয়নীতি এবং শত কোটি টাকার স্বার্থ
অনুসন্ধানে আরও কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে এসেছে। কার্যালয় স্থানান্তরের এই তড়িঘড়ির নেপথ্যে ছিল আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সরাসরি ক্রয়নীতিতে (Direct Purchase Method) জ্বালানি তেল কেনার একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। বিপিসির ঢাকা লিয়াজোঁ অফিসকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল, যারা আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের সাথে সরাসরি যোগাযোগের সুবিধার্থে চেয়ারম্যানকে ঢাকায় স্থায়ী করার জন্য চাপ দিচ্ছিল।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, সম্প্রতি ওপেন টেন্ডার বা উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই সরাসরি তেল কেনার একটি বড় চুক্তি নিয়ে বিপিসির অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তা এবং মন্ত্রণালয়ের টেকনিক্যাল কমিটির সাথে মো. রেজানুর রহমানের তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়। চেয়ারম্যান নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে একক সিদ্ধান্তে কিছু নির্দিষ্ট ফাইল অনুমোদন করাতে চেয়েছিলেন, যা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের ভেতরে এক ধরনের প্রশাসনিক অচলাবস্থা তৈরি হয়। এই ফাইল চালাচালির জের ধরেই মূলত তাঁর অপসারণের ফাইলটি দ্রুত গতি পায়।
ঢাকা লিয়াজোঁ অফিস বাতিলের জোরালো দাবি ও চট্টগ্রামের প্রতিরোধ
চেয়ারম্যানের এই গোপন চক্রান্তের খবর ফাঁস হতেই ফুঁসে ওঠে চট্টগ্রামের নাগরিক সমাজ। এর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মতান্ত্রিক ও তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন ‘সচেতন চট্টলাবাসী’ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ও প্রবীণ সাংবাদিক মুনীর চৌধুরী। চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক অস্তিত্ব রক্ষার এই লড়াইয়ে ব্যবসায়ী নেতা, সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষ একাট্টা হন।
সচেতন মহলের এখন প্রধান ও যৌক্তিক দাবি হচ্ছে—বিপিসির বিতর্কিত ঢাকা লিয়াজোঁ অফিস অনতিবিলম্বে সম্পূর্ণ বাতিল করতে হবে। বিপিসি চেয়ারম্যান এবং সকল পরিচালককে ঢাকার লিয়াজোঁ অফিস সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে চট্টগ্রামের মূল হেড অফিসে নিয়মিত বসতে হবে এবং সেখান থেকেই সমস্ত প্রশাসনিক ও নীতিগত কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। লিয়াজোঁ অফিসের নামে ঢাকায় সমান্তরাল হেড অফিস চালানোর এই অনৈতিক চর্চা বন্ধ না হলে চক্রান্তকারীরা বারবার সুযোগ নেবে বলে মনে করেন আন্দোলনকারীরা।
ওএসডির পর চট্টগ্রামে স্বস্তি ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে মো. রেজানুর রহমানকে ওএসডি করে আদেশ জারি করার পর চট্টগ্রামে স্থানীয় সচেতন মহলে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। সরকারের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে ‘সচেতন চট্টলাবাসী’-র পক্ষে সাংবাদিক মুনীর চৌধুরী এক বিবৃতিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান,
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী,
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী কে আন্তরিক ধন্যবাদ ও গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।
বিবৃতিতে তিনি উল্লেখ করেন, “এই সিদ্ধান্ত কেবল একজন বিতর্কিত কর্মকর্তার অপসারণ নয়, এটি চট্টগ্রামের আপামর জনসাধারণের যৌক্তিক দাবির জয়। তবে এই বিজয় তখনই পূর্ণতা পাবে যখন ঢাকা লিয়াজোঁ অফিসের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের চট্টগ্রামে বসা নিশ্চিত করা হবে।”
ভবিষ্যৎ শঙ্কা ও বিশেষজ্ঞদের মত
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের সমস্ত আমদানিকৃত জ্বালানি তেল যেখানে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে খালাস হয় এবং প্রধান রিফাইনারি (ইস্টার্ন রিফাইনারি) যেখানে চট্টগ্রামে অবস্থিত, সেখানে বিপিসির প্রধান কার্যালয় ঢাকায় নেওয়ার চিন্তা ছিল সম্পূর্ণ আত্মঘাতী এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ নীতির পরিপন্থী।
সচেতন মহলের আশাবাদ, এই দৃষ্টান্তমূলক অপসারণের পর ভবিষ্যতে আর কেউ যেন চট্টগ্রামের কোনো সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের মতো হীন ও স্বার্থান্বেষী চেষ্টা করার সাহস না পায়। বিপিসি এখন যেন পুরোপুরি স্বচ্ছতা এবং চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে তার কার্যক্রম পরিচালনা করে, এটাই এখন চট্টলাবাসীর মূল দাবি।