শত শত কোটি টাকা লোপাটের ‘নিরাপদ খোঁয়াড়’ বিপিসি তিন বছরের অডিটেই সাড়ে ৫০০ কোটি টাকার জালিয়াতি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন-
রাষ্ট্রীয় জ্বালানি খাতের অভিভাবক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে বছরের পর বছর ধরে চলছে নজিরবিহীন আর্থিক জালিয়াতি, লুটপাট ও চরম প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা। সম্প্রতি সমাপ্ত হওয়া সরকারের উচ্চপর্যায়ের তিন বছরের বিশেষ অডিট রিপোর্টে (নিরীক্ষা প্রতিবেদন) বিপিসির অভ্যন্তরে সাড়ে ৫০০ কোটি টাকারও বেশি সরকারি অর্থ সরাসরি তসরূপ ও বাজার মূল্যের চেয়ে কম মুনাফায় এফডিআর (FDR) দেখিয়ে রাষ্ট্রকে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলার সুনির্দিষ্ট এবং অকাট্য প্রমাণ মিলেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের ব্যাংকিং খাতের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা ও বিপিসির শীর্ষ কর্তাদের গোপন আঁতাত, ভুয়া সনদে চাকরি লাভ এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ পাচারের (মানি লন্ডারিং) কারণেই এই বিপর্যয় ঘটেছে। পরিস্থিতি ধামাচাপা দিতে বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (GM) ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (MD) পদমর্যাদার ৭ জন শীর্ষ কর্মকর্তাকে একযোগে বদলি করা হলেও মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন।
১. এফডিআরের সুদে ফাঁকি: ৫০০ কোটি টাকা গায়েব
বিপিসির অধীনে থাকা তিন রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল বিপণনকারী কোম্পানি—পদ্মা অয়েল, মেঘনা অয়েল এবং যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড-এর নিজস্ব শত শত কোটি টাকার উদ্বৃত্ত তহবিল রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী এই টাকা বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে স্থায়ী আমানত বা এফডিআর (FDR) হিসেবে সর্বোচ্চ মুনাফায় বিনিয়োগ করার কথা।
অডিট রিপোর্টে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত বিপিসি বাজারভিত্তিক সঠিক সুদের হারেই এই টাকা জমা রাখছিল। তবে রহস্যজনকভাবে ২০২২-২৩, ২০২৩-২৪ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের ব্যাংকিং খাতে সুদের হার যখন ঊর্ধ্বমুখী, তখন এই তিন বিপণন কোম্পানির শীর্ষ কর্তারা ব্যাংকগুলোর সাথে যোগসাজশ করে অস্বাভাবিক কম সুদে টাকা জমা রাখেন। ব্যাংকের খাতায় সরকারি রেট কম দেখিয়ে বাকি অতিরিক্ত মুনাফার টাকা ব্যাক-ডোর বা আন্ডার দ্য টেবিল কমিশনের মাধ্যমে পকেটে পুরেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এই ৩ বছরে বাজার মূল্যের চেয়ে কম মুনাফায় টাকা রাখার কারণে রাষ্ট্রের সরাসরি ৫০০ কোটি টাকারও বেশি নিট আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
২. এসএওসিএল-এ ‘কাগুজে চেকের’ জাদুকরি: ১১৯ কোটি টাকা পাচার
বিপিসির অন্যতম প্রধান সহযোগী প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (SAOCL)-এর মাধ্যমে সমান্তরালভাবে চলেছে আরেকটি বড় লুটপাট। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই প্রতিষ্ঠানের তৎকালীন এক শীর্ষ পরিচালকের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ‘এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি’-কে সম্পূর্ণ নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে বাকিতে বিপুল পরিমাণ লুব্রিকেটিং অয়েল বা পিচ্ছিলকারক তেল দেওয়া হয়।
প্রতিষ্ঠানটি দায় পরিশোধের নামে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার চেক দিলেও বিপিসির অসাধু কর্মকর্তারা সেই চেক ব্যাংকে জমা না দিয়ে ক্যাশ বক্সে রেখে দিতেন। অথচ কোম্পানির মূল হিসাব বইয়ে (Account Book) টাকা ‘জমা হয়েছে’ বলে ভুয়া এন্ট্রি বা কাগুজে জাদুকরি দেখানো হতো। পরবর্তীতে সময় পার হলে চেকগুলো অনাদায়ী বা বাউন্স দেখিয়ে টাকা পুরোপুরি লোপাট করা হয়। এই সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ১১৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে বিপিসির ৩ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের করেছে। এর আগে দেশের উচ্চ আদালতও (হাইকোর্ট) এই প্রতিষ্ঠানের ৪৭২ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।
৩. জালিয়াতির স্বর্গরাজ্য: ভুয়া সনদে মহাব্যবস্থাপক!
আর্থিক লুটপাটের পাশাপাশি বিপিসির নিয়োগ ও প্রশাসনিক কাঠামোতে ভয়াবহ জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে। বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মোরশেদ হোসাইন আজাদের বিরুদ্ধে বয়স গোপন এবং ভুয়া শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার সনদ (Certificate) জমা দিয়ে বছরের পর বছর ধরে চাকরি করার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এই কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদেই বিপিসির অর্থ বিভাগের বড় বড় ফাইল ও অডিটের আপত্তিগুলো ধামাচাপা দেওয়া হতো বলে অডিট সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে পৃথক বিভাগীয় ও আইনি তদন্ত চলছে।
৪. ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা ও লোক দেখানো রদবদল
এই নজিরবিহীন জালিয়াতি এবং আর্থিক কেলেঙ্কারির খতিয়ান সরকারের শীর্ষ মহলে পৌঁছানোর পর বিপিসির অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দেওয়া হয়েছে। তদন্তের গতিপথ ডাইভার্ট করতে এবং জনরোষ থেকে বাঁচতে বিপিসির প্রধান কার্যালয়ের এক জরুরি আদেশে মহাব্যবস্থাপক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদমর্যাদার ৭ জন শীর্ষ কর্মকর্তাকে একযোগে বদলি করা হয়েছে। তবে সচেতন মহল একে ‘লোক দেখানো আইওয়াশ’ বলে মনে করছেন। বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের অনেককেই পুনরায় অন্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় পদায়ন করার প্রক্রিয়া চলছে।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য-
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের মতে, বিপিসি একটি স্বায়ত্তশাসিত এবং লাভজনক প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও নিজস্ব ব্যাংক আমানত ব্যবহারে জবাবদিহিতার চরম অভাব এবং অডিট আপত্তিগুলোর ওপর দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণেই এই সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। যথাযথ বিচার না হলে রাষ্ট্রের এই কৌশলগত জ্বালানি খাতের ওপর জনগণের আস্থা সম্পূর্ণ ধসে পড়বে।
অনুসন্ধানের মূল তথ্যসমূহ:
১।৫০০+ কোটি টাকা লোপাট: পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েলের উদ্বৃত্ত তহবিল অস্বাভাবিক কম সুদে ব্যাংকে রেখে রাষ্ট্রের বিশাল ক্ষতি।
২। ১১৯ কোটি টাকা পাচার: চেক জاলিয়াতি ও ভুয়া হিসাবের মাধ্যমে সহযোগী প্রতিষ্ঠান এসএওসিএল থেকে কোটি কোটি টাকা গায়েব।
৩।ভুয়া সনদে চাকরি: বয়স গোপন ও ভুয়া সার্টিফিকেটে বহাল তবিয়তে ছিলেন অর্থ বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তা!