আন্দোলনের মুখে পিছু হটল বিপিসি:কার্যালয় স্থানান্তর ঠেকাল ‘সচেতন চট্টলাবাসী”চট্টগ্রামকে
পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক রাজধানী’ বাস্তবায়নে ১২ দফা দাবিতে প্রধানমন্ত্রীকে স্মারকলিপি.
” মুনীর চৌধুরী ”
দেশের প্রধান বন্দর নগরী চট্টগ্রামকে ‘পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক রাজধানী’ হিসেবে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি স্বাধীনতার পর থেকে
দীর্ঘ ৫৫বছরে ও আলোর মুখ দেখেনি। রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে অবহেলা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, মেগা প্রকল্পগুলোর ধীরগতি এবং স্থানীয় নাগরিক সেবার বেহাল দশায় দিন দিন ক্ষোভ বাড়ছে স্থায়ীদের মধ্যে। সম্প্রতি নাগরিক সংগঠন ‘সচেতন চট্টলাবাসী’র ১২ দফা দাবিতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট স্মারকলিপি প্রদান এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ।
একই সঙ্গে, চট্টগ্রামের এই দীর্ঘদিনের দাবিকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতিতেও নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। গত ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, রবিবার, নগরীর ঐতিহাসিক পলোগ্রাউন্ড মাঠে আয়োজিত এক নির্বাচনী জনসভায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছেন যে, বিএনপি ক্ষমতায় এলে চট্টগ্রামকে রাষ্ট্রীয়ভাবে দেশের পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক রাজধানী এবং কর্মসংস্থানের মূল হাব হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
# আন্দোলনের মুখে পিছু হটল বিপিসি: প্রথম জয় চট্টগ্রামবাসীর
এদিকে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢাকাকেন্দ্রীক করার প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে নাগরিক উন্নয়ন সংগঠন সচেতন চট্টলাবাসী । বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় স্থানান্তরের গুঞ্জনে ফুঁসে ওঠে ‘সচেতন চট্টলাবাসী’। সংগঠনটির লাগাতার আন্দোলনের মুখে অবশেষে পিছু হটেছে কর্তৃপক্ষ।
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী’র
পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামেই থাকছে। এই সিদ্ধান্তের পর সচেতন চট্টলাবাসী তাদের পূর্বঘোষিত ৭ জুনের বিক্ষোভ মানববন্ধন কর্মসূচি স্থগিত করেছে। নাগরিক সমাজের এই বিজয় প্রমাণ করে যে, চট্টগ্রামের মানুষ তাদের অধিকার আদায়ে এখন কতটা সোচ্চার।
# কাগজে-কলমে রাজধানী, বাস্তবে শুধুই বঞ্চনা
আইনগত বা প্রশাসনিক কোনো স্থায়ী রূপ না পাওয়ায় ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ শব্দটি এখন চট্টগ্রামের মানুষের কাছে কেবলই এক সান্ত্বনা। দেশের রাজস্ব আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং আমদানী-রপ্তানি বাণিজ্যের সিংহভাগ এই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সম্পন্ন হলেও, মূল বাজেটে ও নীতিনির্ধারণে তার প্রতিফলন মেলা ভার।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, কেন্দ্রীয়ভাবে সমস্ত বড় সিদ্ধান্ত এবং ব্যাংকিং ও বাণিজ্যিক অনুমোদন ঢাকার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রতিনিয়ত স্থবির হয়ে পড়ছে। প্রধান প্রধান করপোরেট অফিসগুলো চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হওয়ায় প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে এই অঞ্চল। জনসভায় তারেক রহমানও তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, “চট্টগ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি—চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু গত ৫৫ বছরেও এই দাবি সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি।”
# মেগা প্রকল্প ও অবকাঠামোর মন্থর গতি
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেল, বে-টার্মিনাল কিংবা মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরের মতো মেগা প্রকল্পগুলোর সুফল পেতে প্রয়োজন ছিল সমন্বিত নগর পরিকল্পনা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন:
* মেরিন ড্রাইভ ও বে-টার্মিনাল: বছরের পর বছর ফাইলবন্দি বা ধীরগতির কারণে আমদানি-রপ্তানির খরচ বাড়ছে।
* জলাবদ্ধতা: প্রতি বর্ষায় হাজার হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্পকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে ডুবছে চট্টগ্রাম। চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জের মতো দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার এখন জোয়ারের পানিতে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
* সেবা খাতের সংকট: গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির তীব্র সংকটের কারণে নতুন শিল্প কারখানা স্থাপন করা যাচ্ছে না।
# ১২ দফার আলোয় নাগরিক আন্দোলন
‘সচেতন চট্টলাবাসী’ সংগঠনের সাম্প্রতিক স্মারকলিপি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে চট্টগ্রামের মানুষ আর কেবল মৌখিক প্রতিশ্রুতিতে সন্তুষ্ট নয়। বিপিসি কার্যালয় ধরে রাখার প্রাথমিক বিজয়ের পর তাদের বাকি ১২ দফার মূল দাবিগুলো আরও জোরালো হয়ে উঠেছে:
১. রাষ্ট্রে আইন পাস করে চট্টগ্রামকে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক রাজধানীর আইনি মর্যাদা দেওয়া।
২. অর্থ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং এনবিআর-এর স্থায়ী বা পূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপন।
৩. বন্দর ও কাস্টমসের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে ২৪ ঘণ্টা ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু।
৪. একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও শক্তিশালী ‘সিটি গভর্নেন্স’ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
# বিশেষজ্ঞদের অভিমত
অর্থনীতিবিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকাকেন্দ্রীক একক অর্থনীতির চাপ কমাতে চট্টগ্রামকে স্বায়ত্তশাসিত বাণিজ্যিক সুবিধা ও ব্যবসার নিরাপদ পরিবেশ দেওয়া এখন সময়ের দাবি। বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে রাখার সিদ্ধান্তটি সঠিক বার্তা দিলেও, সরকারি দলের পুরনো প্রতিশ্রুতি এবং বিরোধী দল বিএনপির নতুন ইশতেহার ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে যদি দ্রুত আইনি কাঠামো তৈরি না হয়, তবে সমগ্র বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে।
চট্টগ্রাম কেবল একটি শহর নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ফুসফুস। এই ফুসফুসকে সচল রাখতে কালক্ষেপণ না করে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ঊর্ধ্বে উঠে চট্টগ্রামকে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক রাজধানী’
হিসাবে এর আইনি ও কাঠামোগত বাস্তব রূপ দেওয়া এখন অত্যন্ত জরুরি।
লেখক –
মুনীর চৌধুরী
প্রতিষ্ঠাতা আহবায়ক
সচেতন চট্টলাবাসী।
আবাসিক সম্পাদক
চ্যানেল এস।