বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনে (বিপিসি) সাড়ে ৫০০ কোটি টাকার অডিট জালিয়াতি ও অর্থ লোপাট:ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা.
শত শত কোটি টাকা লোপাটের ‘নিরাপদ খোঁয়াড়’ বিপিসি: তিন বছরের অডিটেই সাড়ে ৫০০ কোটি টাকার জালিয়াতি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এর অধীনস্থ জ্বালানি তেল বিপণন কোম্পানিগুলো যেন অনিয়ম ও অর্থ লোপাটের এক ‘নিরাপদ খোঁয়াড়’-এ পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিগত তিন বছরের (২০২২-২৩, ২০২৩-২৪ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছর) অভ্যন্তরীণ ও বাণিজ্যিক অডিট প্রতিবেদনে সাড়ে ৫০০ কোটি টাকারও বেশি আর্থিক জালিয়াতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সুকৌশলে এই বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ তসরূপের ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য দ্বৈত নথির আশ্রয় নিয়েছে বিপিসির একটি প্রভাবশালী চক্র।
যেভাবে চলতো এফডিআর জালিয়াতির খেলা
অনুসন্ধানে জানা যায়
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)
হাজার হাজার কোটি টাকার অলস তহবিল বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট রিসিট (FDR) হিসেবে জমা রাখা হয়। জালিয়াতির মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে এই এফডিআর-এর মুনাফার হারকে।
অডিট নথির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থ বাজারে প্রচলিত নিয়মে সর্বোচ্চ মুনাফায় ব্যাংকে জমা রাখা হতো। কিন্তু পরবর্তী তিন অর্থবছরে ব্যাংকের নথিতে মুনাফার প্রকৃত হার (ধরা যাক ৬ থেকে ৭ শতাংশ) উল্লেখ থাকলেও, বিপিসির নিজস্ব হিসাব বই ও নথিপত্রে তা ১ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত কম দেখিয়ে নথিভুক্ত করা হয়েছে।
ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত প্রকৃত মুনাফা এবং বিপিসির খাতায় দেখানো মুনাফার এই বিশাল ব্যবধানের টাকা সরাসরি চলে গেছে একটি প্রভাবশালী চক্রের পকেটে। তিন বছরে এই মুনাফা চুরির পুঞ্জীভূত অঙ্ক সাড়ে ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
নথি জালিয়াতি ও ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা
অডিট দল যখন ব্যাংকের স্টেটমেন্ট এবং বিপিসির ক্যাশ বুকের মধ্যে বিশাল গরমিল পায়, তখন থেকেই শুরু হয় ধামাচাপা দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা। অডিট আপত্তি এড়াতে ব্যাংকের ভুয়া সনদ তৈরি, ব্যাক-ডেটে (পূর্বের তারিখে) নথি সংশোধন এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মৌখিক নির্দেশে হিসাব সমন্বয়ের চেষ্টা করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, “ব্যাংক ও বিপিসির ভেতরের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সরাসরি এই প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত। প্রতি বছর অডিট দল আসার আগে এই ফাঁকফোকরগুলো ঢাকতে কোটি কোটি টাকার লেনদেন অন্য খাতে সরিয়ে সাময়িক জোড়াতালি দেওয়া হতো।”
পুরোনো ক্ষতের নতুন রূপ
বিপিসির সহযোগী প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানির (SAOCL) ৪৭২ কোটি টাকারও বেশি জালিয়াতির ঘটনাটি নিয়ে ইতিপূর্বেই উচ্চ আদালত তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই মূল বিপিসি এই সাড়ে ৫০০ কোটি টাকার নতুন কেলেঙ্কারি প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় এই সংস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বালাই নেই।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনগণের পকেট কেটে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে বিপিসি লাভজনক প্রতিষ্ঠান সাজলেও, ভেতরের অর্থ এভাবে লোপাট হওয়া রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) একজন প্রতিনিধি জানান, “বিপিসির মতো কৌশলগত রাষ্ট্রীয় সংস্থায় বছরের পর বছর ধরে অডিট আপত্তি জমা পড়ে থাকে, কিন্তু কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না। এই সাড়ে ৫০০ কোটি টাকার জালিয়াতির ঘটনা স্বাধীন তদন্ত কমিশনের মাধ্যমে খতিয়ে দেখে দোষীদের কারাগারে পাঠানো উচিত।”
জনস্বার্থে রাষ্ট্রীয় অর্থের এই হরিলুট বন্ধে এবং জালিয়াতির নেপথ্যের কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচনে এখন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের কঠোর হস্তক্ষেপ সময়ের দাবি।