পুলিশের সুখ-দুঃখ:
আড়াই লাখ পুলিশের ৯০% আবাসনহীন-মানসিক যত্নে নেই একজনও চিকিৎসক!
” মুনীর চৌধুরী ”
রোদ হোক কিংবা প্রলয়ংকরী ঝড়, উৎসবের আনন্দ কিংবা রাজনৈতিক সংঘাত—জনগণের জানমালের নিরাপত্তায় ২৪ ঘণ্টা রাজপথে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালন করেন বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা। তবে এই বাহিনীর ভেতরের চিত্রটি চরম অবহেলা, সংকট আর বঞ্চনায় ভরা। আড়াই লাখ সদস্যের বিশাল এই বাহিনীতে ৯০ শতাংশেরই নেই আবাসন সুবিধা, নেই অতিরিক্ত ডিউটির জন্য কোনো ওভারটাইম কাঠামো, আর সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো—দিনরাত মানসিক চাপের মধ্যে থাকা এই আড়াই লাখ পুলিশ সদস্যের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নে নেই নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসক বা বিশেষায়িত সেল। লজিস্টিক সংকট, পদোন্নতির শুভঙ্করের ফাঁকি এবং দীর্ঘদিনের ভাতা বৈষম্য নিয়ে ভেতরে ভেতরে এক চরম অসন্তোষ ও মানসিক অবসাদ দানা বাঁধছে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মধ্যে।
পুলিশের আবাসন ও অবকাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি তীব্র মানসিক চাপ, পদোন্নতি ও বদলি সংক্রান্ত বৈষম্য এবং ভাতা বঞ্চনার বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হলো এই
পুলিশের সুখ দুঃখ কলামে-
১. মানসিক স্বাস্থ্য অবহেলিত: ২৫০,০০০ পুলিশের জন্য নেই একজনও ডেডিকেটেড চিকিৎসক
চব্বিশ ঘণ্টা বিরামহীন ডিউটি, অনাকাঙ্ক্ষিত ছুটি বাতিল এবং পারিবারিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা চরম মানসিক অবসাদে ভোগেন। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)-সহ সারাদেশের কনস্টেবল ও সাব-ইন্সপেক্টরদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তীব্র কর্মচাপের কারণে তাদের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, যা অনেক সময় জনসাধারণের ওপর বা নিজেদের সহকর্মীদের ওপরও সহিংস রূপ নেয়*।
* চিকিৎসক সংকট: পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আড়াই লাখের এই বিশাল বাহিনীতে পুলিশ সদস্যদের নিয়মিত মানসিক কাউন্সিলিং করার জন্য নিজস্ব কোনো সাইকিয়াট্রিস্ট বা রিহ্যাবিলিটেশন সেল নেই।
* পরিণাম: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডিউটিরত অবস্থায় নিজের গুলিতে সহকর্মী হত্যা কিংবা খোদ পুলিশ সদস্যদের আত্মহত্যার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীতে মানসিক স্বাস্থ্যের এমন উপেক্ষা জননিরাপত্তার জন্যই চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
২. আবাসন সংকট: ভাড়া বাসা আর ‘হাসপাতালের ওয়ার্ডের’ মতো ব্যারাক
বিগত দেড় দশকে পুলিশের জনবল প্রায় দ্বিগুণ করা হলেও মাঠপর্যায়ের আবাসন সুবিধা মাত্র ১০ শতাংশের ঘরে থমকে আছে।
* ঢাকায় চরম ভোগান্তি: ডিএমপিতে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের মাত্র ৯.৫% সরকারি কোয়ার্টারের সুযোগ পান, বাকি ৯০.৫০% পরিবার নিয়ে ঢাকার চড়া ভাড়ার বেসরকারি বাসায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বেতনের সিংহভাগ বাড়ি ভাড়ায় চলে যাওয়ায় সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে তাদের জন্য।
* ব্যারাকের করুণ দশা: রাজধানীর শাহবাগ বা বিভিন্ন সাধারণ থানার ব্যারাকে ঢুকলে দেখা যায়, টিনশেড ঘরের ভেতর সারি সারি ছোট বেড বসানো, যা দেখতে অনেকটা হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ডের মতো। অনেক সময় স্থান সংকুলানের অভাবে একই বেডে দুই জন পুলিশ সদস্যকে পালাক্রমে ঘুমাতে হয়। এছাড়া ঢাকার অন্তত ১৫টি থানার কার্যক্রম এখনো প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে বেসরকারি ভাড়া ভবনে পরিচালিত হচ্ছে।
# ৩. পদোন্নতি ও পদায়ন: ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ ও বদলি বাণিজ্য
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষোভের জায়গা হলো পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে বৈষম্য।
* ক্যাডার বনাম নন-ক্যাডার বৈষম্য: একজন সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) যোগদানের ৪ বছর পর পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করলেও শূন্যপদের অভাবে পরীক্ষা পাসের পরও বছরের পর বছর পদোন্নতি পান না। নন-ক্যাডার অফিসারদের ক্ষেত্রে পরিদর্শক থেকে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হতে প্রায় ১৬ থেকে ১৭ বছর লেগে যায়। অনেক পুলিশ সদস্য ৪০ বছর চাকরি করার পরও কোনো পদোন্নতি না পেয়ে কনস্টেবল হিসেবেই অবসরে চলে যান।
* পদায়ন ও লবিং: দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের উপযুক্ত স্থানে পদায়ন না করে একশ্রেণির মহলের তদবির ও লবিংয়ের মাধ্যমে সুবিধাজনক স্থানে বদলি করার অলিখিত চর্চা মাঠপর্যায়ের শৃঙ্খলা ভেঙে দিচ্ছে।
৪. লজিস্টিক ও অবকাঠামো সংকট: জরাজীর্ণ যানবাহন ও ভাঙা থানা
অনেক জেলা ও মেট্রোপলিটন পুলিশ লাইন্সে পর্যাপ্ত এবং আধুনিক যানবাহন নেই। অপরাধীদের ধাওয়া করার জন্য কিংবা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর জন্য যে ধরনের পিকআপ বা মোটরবাইক প্রয়োজন, তার বড় অংশই জরাজীর্ণ বা বিকল। অনেক সময় পুলিশ সদস্যদের নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করে বা লিজ নেওয়া গাড়িতে করে আসামি ধরতে যেতে হয়। দেশের বহু প্রত্যন্ত অঞ্চলের থানা ভবনগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রাচীন, যেখানে নারী পুলিশ সদস্যদের জন্য আলাদা শৌচাগার বা বিশ্রামের ন্যূনতম ব্যবস্থাও নেই।
৫. ভাতা বঞ্চনা ও অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা
পুলিশের সাধারণ কনস্টেবলদের দৈনিক ডিউটি করার কথা ৮ ঘণ্টা, কিন্তু মাঠপর্যায়ে তাদের ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত ডিউটি করতে হয়।
* ওভারটাইম নেই: এই অতিরিক্ত খাটার জন্য দীর্ঘদিন যাবত তারা কোনো বাড়তি ওভারটাইম বা কাজের মূল্যায়ন পাননি।
* খোরাকি ভাতার দৈন্যদশা: বর্তমানে প্রশিক্ষণাধীন পুলিশ সদস্যদের খোরাকি ভাতা ও রেশন সামগ্রী বাজারদরের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর বা কনস্টেবলরা দৈনিক ১৫-১৬ ঘণ্টা কঠোর শারীরিক পরিশ্রম করলেও তাদের জন্য বরাদ্দ মাসিক ভাতা পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়।
# সুড়ঙ্গের শেষে আলোর রেখা: সরকারি কিছু নতুন আশ্বাস
সাম্প্রতিক পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত কল্যাণ সভায় প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুলিশের এই দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর করতে কিছু ইতিবাচক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন:
১. ওভারটাইম ভাতা চালুর পরিকল্পনা: অতিরিক্ত ডিউটির জন্য কনস্টেবল থেকে ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার সদস্যদের জন্য বিশেষ নীতিমালার আলোকে ওভারটাইম ভাতা চালুর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
২. অবসরকালীন অনারারি পদোন্নতি: যারা সারাজীবন ভালো রেকর্ড নিয়েও পদোন্নতি পাননি, তাদের সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় অবসরকালীন সময়ে কনস্টেবল থেকে অনারারি এএসআই এবং এসআই থেকে অনারারি ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতির নীতিমালা তৈরি হচ্ছে।
৩. আধুনিক চিকিৎসা ও আবাসন: কেন্দ্রীয় ও বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালগুলোকে আধুনিকায়ন করার পাশাপাশি পুলিশের তীব্র আবাসন সংকট মেটাতে ভূমি অধিগ্রহণ ও নতুন ভবন নির্মাণের কাজকে অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা হয়েছে।
পুলিশ বাহিনীকে প্রকৃত অর্থেই জনবান্ধব ও পেশাদার করতে হলে কেবল তাদের জনবল বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। আড়াই লাখ সদস্যের মানসিক স্বাস্থ্যের দেখভাল করতে প্রতিটি পুলিশ লাইন্সে স্থায়ী মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ, শতভাগ আবাসন নিশ্চিতকরণ এবং পদোন্নতির আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দ্রুত দূর করা প্রয়োজন। মৌলিক চাহিদাগুলো অপূর্ণ রেখে পুলিশের কাছ থেকে শতভাগ সেবা আশা করা অন্যায়।